জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) হাই-লেভেল মঞ্চে আবারও মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তান। তবে এবারের কূটনৈতিক যুদ্ধ কেবল কাশ্মীর বা সীমান্ত সংঘাতের চেনা বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সাথে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংবেদনশীল এবং জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি (Indus Waters Treaty - IWT)।
![]() |
| somadanmedia.com |
রাষ্ট্রপুঞ্জের ৮১তম অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ভারতকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সিন্ধু নদের পানির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বা ভারতের পক্ষ থেকে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টাকে পাকিস্তান ‘যুদ্ধের উসকানি’ (Act of War) হিসেবে গণ্য করবে। শেহবাজের এই চরম এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের জবাবে ভারতও তার কূটনৈতিক অস্ত্রাগারের সবচেয়ে ধারালো প্রতিক্রিয়াটি দেখিয়েছে। জাতিসংঘে ভারতের প্রথম সচিব পেটাল গেহলট (Petal Gahlot) পাকিস্তানের এই আক্রমণকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বমঞ্চে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের ‘সন্ত্রাসবাদ, ছলনা ও কপটতা’ (Terrorism, Deceit, and Duplicity) জনসমক্ষে উন্মোচন করেছেন।
১. প্রেক্ষাপট: পাহলগাম হামলা এবং সিন্ধু চুক্তি স্থগিতের ভারতীয় কৌশল
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে জল কূটনীতির এই সাম্প্রতিক ও নজিরবিহীন উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল মূলত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে। জম্মু ও কাশ্মীরের পাহলগামে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিরীহ ভারতীয় নাগরিক নিহত হন। ভারতের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী নিশ্চিত করে যে, এই হামলার পেছনে সরাসরি পাকিস্তান-ভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মদদ ছিল।
এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় এবং পাকিস্তানকে একটি কঠোর কৌশলগত বার্তা দিতে ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকার একটি ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল, ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে—১৯৬০ সালের সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তিকে সাময়িকভাবে স্থগিত (In Abeyance) রাখা হচ্ছে।
নতুন দিল্লির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে, রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে পাকিস্তান যতদিন না পর্যন্ত আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং সমর্থন বন্ধ করছে, ততদিন এই পানি চুক্তি কার্যকর করা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। ভারতের এই "রক্ত ও পানি একসাথে বইতে পারে না" নীতি পাকিস্তানের ওপর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে।
২. রাষ্ট্রপুঞ্জে শেহবাজ শরিফের ‘যুদ্ধের হুমকি’ ও পানিকে অস্ত্র বানানোর অভিযোগ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ভারতের এই কৌশলগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি ভারতকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করেন।
শেহবাজ শরিফের মূল যুক্তি ও দাবিগুলো ছিল:
• চুক্তি স্থগিতের আইনি ভিত্তিহীনতা: শেহবাজ শরিফ দাবি করেন যে, ভারতের পক্ষ থেকে সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তিকে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ভিয়েনা কনভেনশনের দোহাই দিয়ে তিনি বলেন, এই চুক্তি এখনও সম্পূর্ণ বৈধ এবং কার্যকর।
• পানির অস্ত্রিকায়ন (Weaponisation of Water): পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ভারত পানিকে একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে, যা পাকিস্তানের ২৪ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে। নদীগুলো জাতিগুলোকে বিভক্ত করার জন্য নয়, বরং পুষ্ট করার জন্য হওয়া উচিত।
• যুদ্ধের হুঁশিয়ারি: তিনি অত্যন্ত আগ্রাসী ভাষায় বলেন, "সিন্ধু নদের পানিতে পাকিস্তানের যে ন্যায্য অংশ রয়েছে, তা আটকানো, বাধা দেওয়া বা অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাকে যুদ্ধের উসকানি হিসেবে দেখা হবে এবং ভারতের এই বিষয়ে কোনো ভুল ধারণা থাকা উচিত নয়।"
শুধু তাই নয়, শেহবাজ শরিফ তাঁর ভাষণে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘটে যাওয়া সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতের (অপারেশন সিন্দুর) প্রসঙ্গ টেনে আনেন এবং দাবি করেন যে পাকিস্তান সে সময় ভারতের সাতটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল। একই সাথে, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৎকালীন মধ্যস্থতার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান।
৩. ভারতের তীব্র পাল্টা জবাব: "সন্ত্রাসবাদীদের লুকানোর কোনো জায়গা থাকবে না"
পাকিস্তানের এই নাটকীয় এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের পর ভারত তার 'রাইট অব রিপ্লাই' (Right of Reply) বা জবাব দেওয়ার অধিকারের পূর্ণ ব্যবহার করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কক্ষে ভারতের তরুণ কূটনীতিক পেটাল গেহলট পাকিস্তানের প্রতিটি অভিযোগকে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে খণ্ডবিখণ্ড করেন।
ভারতের তরফ থেকে দেওয়া কড়া জবাবের মূল দিকগুলো:
জাতিসংঘে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের প্রধান কূটনৈতিক বাণ
- ১. সন্ত্রাসবাদের কারখানা: পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে নিজেকে ভুক্তভোগী দাবি করলেও তারাই সন্ত্রাসের মূল পৃষ্ঠপোষক।
- ২. ওসামা বিন লাদেনের আশ্রয়স্থল: নিউইয়র্কের মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, লাদেন পাকিস্তানেই লুকিয়ে ছিল।
- ৩. পরিণতির হুঁশিয়ারি: পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না করলে ভারতকে আত্মরক্ষার্থে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে হবে।
• ছলনা ও কপটতার মুখোশ উন্মোচন: ভারতীয় প্রতিনিধি সাফ জানিয়ে দেন যে, কোনো ধরনের নাটক বা মিথ্যাচার দিয়ে পাকিস্তান তাদের আসল চরিত্র বিশ্বমঞ্চে লুকাতে পারবে না। পাকিস্তানের মূল নীতিই হলো ‘সন্ত্রাসবাদ, ছলনা ও কপটতা’।
• ৯/১১ এবং ওসামা বিন লাদেন প্রসঙ্গ: নিউইয়র্কের যে মাটিতে দাঁড়িয়ে শেহবাজ শরিফ শান্তির কথা বলছিলেন, ঠিক সেই শহরের বুকেই ঘটেছিল ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলা। ভারত বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যে, সেই হামলার মাস্টারমাইন্ড ওসামা বিন লাদেনকে বছরের পর বছর ধরে আশ্রয় দিয়েছিল এই পাকিস্তানই এবং মার্কিন বাহিনী তাকে পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটির নাকের ডগা থেকেই খতম করেছিল।
• পরিণতির কড়া বার্তা: পেটাল গেহলট সরাসরি সতর্ক করে বলেন, "পাকিস্তানকে অবশ্যই সন্ত্রাসবাদের পথ ত্যাগ করতে হবে। ভারত নিজের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকদের রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার রাখে। পাকিস্তান যদি সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ অব্যাহত রাখে, তবে এর মারাত্মক পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে। সন্ত্রাসবাদীদের পালানোর বা লুকিয়ে থাকার কোনো জায়গা ভারত আর রাখবে না।"
৪. পাকিস্তানের সামরিক দাবির অসারতা ও ভারতীয় কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া
ভাষণ চলাকালীন শেহবাজ শরিফ যখন ২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতে পাকিস্তানের "তথাকথিত সামরিক বিজয়" এবং ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করার কাল্পনিক দাবি করছিলেন, তখন জাতিসংঘের অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ভারতীয় কূটনীতিকদের মুখে দেখা যায় তাচ্ছিল্যের হাসি। ভারতীয় প্রতিনিধি আর. শ্রীনিবাসের এই হাসির ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ভারতীয় সরকারি সূত্রের বরাতে স্পষ্ট করা হয় যে, পাকিস্তান নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এবং অর্থনৈতিক ব্যর্থতা থেকে জনগণের চোখ ঘোরাতে বিশ্বমঞ্চে এই ধরনের কাল্পনিক এবং মিথ্যা গল্প ফেঁদেছে। ভারত মনে করিয়ে দেয়, গত বছরের সংঘাতের সময় পাকিস্তানের নিজস্ব বিমানঘাঁটি ও হ্যাঙ্গারগুলোর কী বিপুল ক্ষতি হয়েছিল, তার স্যাটেলাইট চিত্র ও প্রমাণাদি আজ পুরো বিশ্বের সামনে উন্মুক্ত।
৫. সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তির গুরুত্ব এবং কেন এটি পাকিস্তানের জন্য মরণফাঁদ?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কেন জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে পানি চুক্তি নিয়ে এত বড় যুদ্ধের হুমকি দিলেন, তা বুঝতে হলে এই চুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব বোঝা প্রয়োজন।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মধ্যে এই সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী:
• পূর্বদিকের তিনটি নদী (রাভি, বিয়াস ও সতলেজ)-এর পানির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পায় ভারত।
• পশ্চিমদিকের তিনটি নদী (সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব)-এর পানির সিংহভাগ বরাদ্দ করা হয় পাকিস্তানের জন্য।
পাকিস্তানের পানি সংকটের মূল কারণসমূহ:
- ১. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার লাইফলাইন: পাকিস্তানের অর্থনীতি এবং বিশেষ করে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের বিশাল কৃষি বলয় সম্পূর্ণভাবে সিন্ধু নদ এবং এর উপনদীগুলোর পানির ওপর নির্ভরশীল।
- ২. বিদ্যুৎ উৎপাদন: পাকিস্তানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সিংহভাগই এই নদীগুলোর পানির গতিপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে তৈরি।
- ৩. ভারতের ভৌগোলিক সুবিধা: যেহেতু এই সবকটি নদীই ভারত শাসিত অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে, তাই ভারত যদি আন্তর্জাতিক আইন মেনেও এই নদীগুলোর ওপর বাঁধ বা জলাধার নির্মাণ শুরু করে, তবে পাকিস্তানের কৃষিখাত সম্পূর্ণ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
ভারতের এই "কৌশলগত জল-নীতি পরিবর্তন" পাকিস্তানের অস্তিত্বের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছে। ফলে, ইসলামাবাদ এখন আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য এই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
৬. উপসংহার: দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি কোন পথে?
জাতিসংঘের এই দ্বিপাক্ষিক বাগযুদ্ধ প্রমাণ করে যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক এখন এক জটিল ও বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং অনমনীয়—সন্ত্রাস এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা চুক্তি কখনো একসাথে চলতে পারে না। পাকিস্তান একদিকে ভারতের মাটিতে নিরপরাধ মানুষদের রক্ত ঝরাবে, আর অন্যদিকে ভারতের ভূখণ্ড থেকে বয়ে যাওয়া নদীর পানি ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখবে—এই দ্বিচারিতা আর মেনে নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, পাকিস্তান তাদের চিরাচরিত পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের পাশাপাশি এখন ‘পানি যুদ্ধ’ বা ‘জলবায়ু বিপর্যয়’-এর কার্ড খেলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তবে ওসামা বিন লাদেনের আশ্রয়দাতা হিসেবে বৈশ্বিক মঞ্চে তাদের যে কুখ্যাতি রয়েছে, তা শেহবাজ শরিফের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যের আড়ালে ঢাকা সম্ভব হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে পাকিস্তানকে এই সত্যটি অনুধাবন করতে হবে যে—হুমকি বা যুদ্ধের হুঙ্কার দিয়ে নয়, বরং নিজেদের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন করার মাধ্যমেই কেবল তারা ভারতের সাথে যেকোনো প্রকার আলোচনা বা চুক্তির টেবিলে বসার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে। তা না হলে, ভারতের এই কঠোর জল-কূটনীতি আগামী দিনে পাকিস্তানের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
